প্রযুক্তির নিত্য নতুন আবিস্কারের কথা আমরা প্রতিনিয়তই শুনতে পাই। এই উন্নত প্রযুক্তির উদ্ভাবনের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র চীন, কিংবা রাশিয়া সারা বিশ্বে সত্যিই ঈর্ষানীয় নাম। তাদের উদ্ভাবনের খাতায় যুক্ত হয়েছে নতুন আরেকটি বিস্ময়কর প্রযুক্তি, যার নাম হাইপারসনিক বিমান।
সর্বপ্রথম বলে রাখা ভাল আমরা যেসব বিমানে চড়ে বিদেশে ভ্রমণ করি সেসব বিমানের চেয়ে হাইপারসনিক বিমান কিন্তু অনেকটা ভিন্ন।
সাধারণত যাত্রীবাহী বিমানের গতিবেগ হয়ে থাকে ঘণ্টায় ৪৭৫-৫০০ নটস(Knots)।
উল্লেখ্য ১ নট = ১.৮৫২ কিঃমিঃ।
অর্থাৎ ঘণ্টায় ৮৭৮-৯২৬ কিঃমিঃ বা ৫৪৬-৫৭৫ মাইল।
উল্লেখ্য ১ নট = ১.৮৫২ কিঃমিঃ।
অর্থাৎ ঘণ্টায় ৮৭৮-৯২৬ কিঃমিঃ বা ৫৪৬-৫৭৫ মাইল।
একটা রেড বুল রেসিং প্লেনের গতি ঘণ্টায় প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার।
অপরদিকে, হাইপারসনিক গতি বলতে ঘণ্টায় ৩,৮৪০ মাইল থেকে ৭,৬৮০ মাইল পর্যন্ত বোঝায়৷ উল্লেখ্য, শব্দের গতিবেগ ঘণ্টায় ১,২৩৪ কিলোমিটার বা ৭৬৭ মাইল৷ হ্যাঁ, ঠিক-ই পড়েছেন ! শব্দের গতির চেয়ে প্রায় ৫ থেকে ১০ গুণ গতি সম্পন্ন হয়ে থাকে হাইপারসনিক বিমান।
বুঝতেই পারছেন সাধারণ বিমানের চেয়ে এর পার্থক্যটা কতটুকু। শুধু কি তাই এই হাইপারসনিক বিমানে রয়েছে সব হাইটেক প্রযুক্তি যার একটিও সাধারণ বিমানে নেই। মূলত এসব হাইপারসোনিক বিমানগুলো তৈরি করা হয় শত্রু পক্ষের বায়ুসীমায় প্রবেশ করে গোপন তথ্য সংগ্রহ করতে।
আজকে এরকম কিছু হাইপারসনিক যুদ্ধ বিমানের কথা আমরা জানব।
সন অফ ব্ল্যাকবার্ড’-৭২ ঃ
ফক্স নিউজ সূত্রের তথ্যমতে, এই বছরের জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র একটি হাইপারসনিক বিমান নির্মাণের ঘোষণা দেয়। বিমানটি ২০২০ সালের মধ্যে মার্কিন বিমান নির্মাণকারী সংস্থা “বোয়িং” মার্কিন বাহিনীর হাতে তুলে দেয়ার কথা। এটি হতে শব্দের চেয়েও পাঁচগুণ বেশি দ্রুতগামী একটি ‘স্পাই প্লেন’ বা নজরদারি বিমান। গতিবেগ হবে ঘণ্টায় প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার। বিমানটির পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে এস আর-৭২।
অপরদিকে এটিই হবে বিশ্বের সব থেকে দ্রুতগামী বিমান বলে ধারণা করা হচ্ছে । বর্তমানে এই রেকর্ড রয়েছে বোয়িংয়েরই বিমান ব্ল্যাকবার্ড এস আর-৭১-এর দখলে। ১৯৭৬ সালে সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা বগে উড়ে রেকর্ড তৈরি করে এস আর-৭১। সোভিয়েত আমলের ওই বিমানের বিকল্প হিসেবে ‘সন অফ ব্ল্যাকবার্ড এস আর-৭২ তৈরি করছে বোয়িং।
স্টারি স্কাই-২ঃ
গত ৭ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাতে প্রথমবারের মতো জিংকং-২ বা স্টারি স্কাই-২ নামের এ বিমান পরীক্ষা করে চীন। দেশের উত্তর-পশ্চিম এলাকা থেকে ১০ মিনিটের জন্য বিমানটিকে আকাশে ওড়ানো হয় ।স্টারি স্কাই-২ বিমানটি শব্দের গতির চেয়ে ছয়গুণ গতিতে আকাশে উড়তে পারে বলে চীনের একাডেমি অব অ্যারোস্পেস অ্যারোডাইনামিক জানিয়েছে।
চীনের সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞ সং ঝংপিং বলেন, এটি এমন একটি আকাশযান যেটি বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে ওড়ে চলে এবং নিজের তৈরি শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে দ্রুতগতিতে ছুটে চলে। অত্যাধুনিক এ অস্ত্রের মাধ্যমে চীন এরই মধ্যে প্রযুক্তিতে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছে।
বর্তমান ক্ষেপণাস্ত্র সুরক্ষাব্যবস্থায় প্রধানত ওই সব ক্ষেপণাস্ত্রকে শনাক্ত করে ধ্বংস করা যায়, যেগুলোর গতি হয় ধীর অথবা যেগুলোকে সহজেই শনাক্ত করা যায়। কিন্তু স্টারি স্কাই-২ এয়ারক্রাফটি আকাশে থাকাকালে সেটির কক্ষপথ আগে থেকে অনুমান করা প্রায় অসম্ভব। তা ছাড়া প্রচণ্ড গতির কারণে এটি বর্তমান ক্ষেপণাস্ত্রবিরোধী প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বড় ধরনের পরীক্ষায় ফেলতে সক্ষম।
কর্মকর্তারা বলছেন, পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ সফল ছিল। এ বিমান আন্তর্জাতিক সর্বাধুনিক বিমানগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেবে বলেও তারা মনে করেন।
মার্কিন বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা মার্ক স্ট্রোক জানিয়েছেন এই ধরণের বিমানের গতি ৯,১২৭ মাইল পর্যন্ত হতে পারে এবং তা মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে এড়াতে সক্ষম ৷ চীন ছাড়াও বর্তমানে এই ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র বিমান তৈরির চেষ্টায় রয়েছে আমেরিকা, ভারত ও রাশিয়া ।
যদি এই হাইপারসনিক বিমানটি চীন সফলভাবে চালু করতে পারে তাহলে এটিই হবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দ্রুতগামী হাইপারসনিক বিমান । এটির গতি সন অফ ব্ল্যাকবার্ড’-৭২ এর গতিকেও হার মানাবে ।
অ্যাভানগ্রাদ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ঃ
রাশিয়ার নতুন ও উন্নত পরমাণু অস্ত্র আগামী দুই বছরের মধ্যে সামরিক বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
রুশ সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুক্রবার সোচি শহরে এক বৈঠকে পুতিন তাদের এ তথ্য জানিয়েছেন।
পুতিন বলেন, নতুন অ্যাভানগ্রাদ হাইপারসনিক যান আগামী বছর চালু হবে এবং তাতে থাকবে স্মার্ট আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যা ২০২০ সাল থেকে সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হবে।
পুতিনের তথ্যমতে, রাশিয়ার নতুন পরমাণু অস্ত্র যে কোনো বিদেশি অস্ত্রের চেয়ে উন্নত এবং এসব অস্ত্র বিদেশিদের চেয়ে সম্ভবত কয়েক দশক এগিয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, বিদেশিদের অস্ত্র অনেক বেশি ব্যয়বহুল কিন্তু অকার্যকর ও সেকেলে।
অ্যাভানগ্রাদ এবং স্মার্ট ক্ষেপণাস্ত্র গত মার্চ মাসে প্রদর্শন করা হয়। অ্যাভানগ্রাদের রয়েছে আন্তঃমহাদেশীয় পাল্লা এবং বায়ুমণ্ডলে শব্দের চেয়ে ২০ গুণ দ্রুত চলতে পারে।
পুতিন বলেন, রাশিয়ার নতুন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র চলার পথে গতি ও উচ্চতা দুটোই পরিবর্তন করতে পারে এবং কোনো বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না।
এছাড়া রাশিয়া কিনঝাল হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও লেসার গাইডেড অস্ত্র পেরেজেভেতের কথাও উল্লেখ করেন প্রেসিডেন্ট। এ দুটি অস্ত্র এরই মধ্যে রুশ বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সুদর্শন চক্র ঃ
৪৫০০ বছর আগে কালান্তক সুদর্শন চক্র দ্বাপর যুগে শিরশ্ছেদ করেছিল শিশুপালের। নাশ করেছিল আসুরিক শক্তির। মহাভারতের সেই শ্রীকৃষ্ণের বিধ্বংসী অস্ত্রই এবার আসতে চলেছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে।
প্রায় ৪৫০০ বছর আগে দ্বাপর যুগের শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন চক্রের আদলে, ব্রাহ্মস মিসাইলের নির্মাতা ‘’ব্রহ্মস এরোস্পেস’” এমন একটি হাইপারসোনিক মিসাইল বানাচ্ছে যা শত্রু দেশের সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করে ফের লঞ্চপ্যাডে ফিরে আসবে। এই মিসাইলটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য।
ব্রাহ্মসের সিইও সুধীর কুমার মিশ্র ২০১৭ সালের প্রথম দিকে একটি অনলাইন পত্রিকাকে জানিয়েছিলেন যে , শব্দের থেকেও ১০ গুণ বেশি গতিসম্পন্ন ‘হাইপারসনিক’ এই মিসাইলটি । তিনি আরও জানান, নির্ধারিত লক্ষ্যে আঘাত হানার পর ক্ষেপণাস্ত্রটি ফিরে আসবে লঞ্চপ্যাডে। এই প্রজেক্টটি প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের স্বপ্ন ছিল বলেও জানান মিশ্র। ভারতীয় মিসাইল প্রযুক্তির জনক রূপে পরিচিত ‘মিসাইল ম্যান’ কালাম চেয়েছিলেন একটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে। এই ক্ষেপণাস্ত্রটির বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যায় নি।
বিশ্ব রাজনীতির দাবার ছকে এক সময়ের পরম বন্ধুই আজ শত্রু । উল্কাবেগে আধুনিকীকরণ ও ক্ষমতা প্রসারে মেতেছে লালফৌজ। তাই নতুন নতুন শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করতে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ বিমান উন্মোচিত হচ্ছে । এখন শুধু বিশ্ববাসীর দেখবার পালা !


Post A Comment: