☼ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি :
১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ১১ নভেম্বর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার ২০ বছর পর পৃথিবী আবার একটি ভয়ংকর বিশ্বযুদ্ধের মখোমুখি হয়। এই মহাযুদ্ধ আগেরটি অপেক্ষা আরও ভয়াবহ ও ব্যাপক আকারে সংঘটিত হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানে ভার্সাই সন্ধির শর্তাবলির মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি রচিত হয়েছিল।
বিশ্বশান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে ভার্সাই সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল । ভার্সাই সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে পরাজিত জার্মানিকে সবদিক থেকে কোণঠাসা করে রাখাই ছিল মিত্রপক্ষের আসল উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তারা জার্মানির ওপর কতকগুলি শর্ত আরোপ করে।
মিত্রপক্ষ পরাজয়ের সুযোগ নিয়ে জার্মানিকে সকল দিক থেকে পঙ্গু করে রাখে। পরাজিত জার্মানির পক্ষে সন্ধির শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না । জার্মানির নাত্সী নেতা হিটলার প্রথম থেকেই এসবের দাবির বিরোধিতা করে। পরে তাঁরই নেতৃত্বে জার্মানি প্রতিশোধ স্পৃহায় উন্মত্ত হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি রচনা করে।
আরও পড়ুন-
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস, কারণ এবং ফলাফল
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস
কার্গিল যুদ্ধের ইতিহাস
ইটালির ফ্যাসিবাদ এবং জাপানের সমরবাদও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে তোলে। এই সব দেশের শাসককূল প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির গণতান্ত্রিক আশা-আকাঙ্ক্ষা চূর্ণ করে দিয়ে সেই সব দেশে সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের নেশায় মেতে ওঠে। জাপান ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে চিনের মাঞ্চুরিয়া দখল করে।
১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে চিনের নানকিং, পিকিং সহ বহু শহরের দখল নেয়। ইটালি ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে আবিসিনিয়া দখল করে। এইসব দেখে জার্মানিও সাম্রাজ্য বিস্তারে লেগে পড়ে। রাশিয়াও বাল্টিক রাষ্ট্রগুলি দখলে এনে তার মধ্য দিয়েই ভূমধ্যসাগরে প্রবেশের পথ খুঁজছিল।
এই অবস্থায় জার্মানি ও ইটালিকে বাধা দেওয়ার পরিবর্তে দুই শক্তিশালী দেশ ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স তাদের প্রতি তোষণনীতি গ্রহণ করে। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স তোষণ নীতি গ্রহণ করায় নাৎসি জার্মানি হিটলারের নেতৃত্বে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। হিটলার আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তিনি রাইন ভূখন্ড, অস্ট্রিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া প্রভৃতি দেশগুলিকে একের পর এক আক্রমণ করে দখল করে নেন।
১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১লা সেপ্টেম্বর হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করলে জার্মানির প্রতি তোষণ নীতি ত্যাগ করে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ৩রা সেপ্টেম্বর যুদ্ধ ঘোষণা করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। বিশ্বের তাবৎ শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি এক এক পক্ষ নিয়ে এই যুদ্ধে যোগদান করে। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ একটানা ছয় বছর ধরে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার দেশগুলিতে এই ভয়ংকর যুদ্ধ চলে । মিত্রশক্তির কাছে জাপানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান হয়। ইটালি ও জার্মানি আগেই পরাজয় স্বীকার করেছিল। হিটলারের প্রতি ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষের তোষণনীতিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি রচনা করে।
আরও পড়ুন-
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস, কারণ এবং ফলাফল
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস
কার্গিল যুদ্ধের ইতিহাস
☼ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ :
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিরাট ধ্বংসকার্য শেষ হওয়ার মাত্র একুশ বছরের মধ্যেই বিশ্ববাসী আর একটি বিধ্বংসী যুদ্ধের মুখোমুখি হয় । বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে এই বিশ্বযুদ্ধের দ্বারা ক্ষতি গ্রস্থ হয় । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ ব্যাখ্যাকালে ঐতিহাসিকরা নিম্নলিখিত বিষয়গুলি তুলে ধরেছেন, যেমন—
ভার্সাই সন্ধির কঠোরতা ও জার্মানির প্রতিশোধ স্পৃহা:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী মিত্রপক্ষ পরাজিত জার্মানির ওপর বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণের বোঝা চাপিয়ে দেয় । সন্ধির শর্ত সম্পর্কে জার্মান প্রতিনিধিদের মতামত উপেক্ষা করে তাঁদের সন্ধিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছিল । সেই একতরফা চুক্তিকে জার্মানির জনগণ কোনো দিনই মেনে নেননি । ইতিমধ্যে জার্মানি ভিতরে ভিতরে সামরিক শক্তিকে সুসজ্জিত করে তোলে। জার্মানির জনগণের সেই জনরোষকে কাজে লাগিয়ে তাই মাত্র কুড়ি বছরের মধ্যেই অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি জার্মানি ভার্সাই সন্ধির সমস্ত অপমানজনক চুক্তি ভেঙে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় । বলা যেতে পারে ভার্সাই সন্ধির কঠোরতার মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ নিহিত ছিল ।
ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের তোষণ নীতি :
হিটলারের প্রতি ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের আপসমূলক তোষণ নীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল । জার্মানির বেপরোয়া অস্ত্রসজ্জা, রাইনল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ও চেকোস্লোভাকিয়া দখল প্রভৃতি ক্ষেত্রে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স কোনো রকম বাধা না দেওয়ায় জার্মানি আরও বেপরোয়া ও আগ্রাসী হয়ে ওঠে । এই কারণেই ঐতিহাসিক এ. জে. পি. টেলর হিটলারের প্রতি ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের আপসমূলক তোষণ নীতিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ বলে অভিহিত করেছেন ।
আরও পড়ুন-
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস, কারণ এবং ফলাফল
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস
কার্গিল যুদ্ধের ইতিহাস
বৃহৎ শক্তিবর্গের অনুপস্থিতি :
মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনের চেষ্টাতে জাতিসংঘ স্থাপিত হলেও মার্কিন সেনেট তা অনুমোদন করে নি । ফলে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশাল দেশ জাতিসংঘের বাইরে ছিল । ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের হাতে জাতিসংঘের দায়িত্ব থাকলেও আমেরিকার অনুপস্থিতিতে তারা বিশ্ব উত্তেজনা প্রশমনে ব্যর্থ হয় ।
জার্মানি, ইতালি ও জাপানের উপনিবেশ বিস্তারের আকাঙ্খা :
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও আমেরিকা বিশ্বের অধিকাংশ উপনিবেশ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় । জার্মানি, ইতালি ও জাপানের ভাগ্যে কোনো উপনিবেশই জোটেনি । জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও কাঁচামাল সংগ্রহের জন্যে এই দেশগুলি উপনিবেশ দখলের কর্মসূচি গ্রহণ করে । এই ভাবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, যার ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ডেকে আনে ।
গণতন্ত্রী রাষ্ট্রগুলির মতবিরোধের সুযোগে ফ্যাসিবাদী শক্তির বিস্তার :
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে মত বিরোধ দেখা দেয় । দুই বৃহৎ গণতন্ত্রী রাষ্ট্রের এই মতবিরোধ ফ্যাসিবাদী শক্তির বিস্তারকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছিল ।
জাতি সংঘের ব্যর্থতা :
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান এবং সেই সঙ্গে বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য লিগ অফ নেশনস বা জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠা হয় । কিন্তু জাতিসংঘের ব্যর্থতার জন্যই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রের বিপর্যয় ঘটে এবং ফ্যাসিবাদী ও নাৎসিবাদী একনায়কতন্ত্রের উত্থান হয়, যার ফলশ্রুতিতে বিশ্ববাসী আরও একটি ভয়াবহ ও নৃশংস বিশ্বযুদ্ধের সম্মুখীন হয় ।
জাতিসংঘের ব্যর্থতার কারণ গুলি ছিল-
(ক) সাংগাঠনিক ত্রুটি,
(খ) নিজস্ব সেনাবাহিনীর অভাব,
(গ) বৃহৎ শক্তিবর্গের অনুপস্থিতি,
(ঘ) নিরস্ত্রীকরণে ব্যর্থতা,
(ঙ) সদস্য রাষ্ট্রের ভিটো প্রয়োগ প্রভৃতি।
আরও পড়ুন-
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস, কারণ এবং ফলাফল
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস
কার্গিল যুদ্ধের ইতিহাস
এইভাবে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার মূল দায়িত্ব পালনে লিগ অফ নেশনস ব্যর্থ হয়, যার পরিণতিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবসম্ভাবী হয়ে ওঠে ।
☼ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত কালপঞ্জি:
৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৩৮ : মিউনিখ চুক্তি১৯৩৮ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিলি চেম্বারলেইন ইউরোপকে যুদ্ধমুক্ত রাখার উদ্যোগ নেন। ইউরোপে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর আগ্রাসন রুখতে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর আগে জার্মানি অস্ট্রিয়া দখল করে নেয় এবং চেকোস্লোভাকিয়ার কাছ থেকে সুদাতেনল্যান্ড দাবি করে। ৩০ সেপ্টেম্বরের মিউনিখ চুক্তি অনুসারে চেকোস্লোভাকিয়ার সুদাতেন অঞ্চল জার্মানিকে হস্তান্তর করার জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং তার বিনিময়ে হিটলার আর কোনো ভূমি দখল করবেন না বলে প্রতিশ্র“তি দেন।
কিন্তু সাতমাস পরে ১৯৩৯ সালের ১৫ মার্চ হিটলার সমগ্র চেকোস্লোভাকিয়া আক্রমণ করে দখল করেন।
১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ : পোল্যান্ড আক্রমণ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করে। এর মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। ১৫ লাখ জার্মান সেনা সীমান্তে অবস্থান নেয় ও ১৩০০ যুদ্ধবিমান পোল্যান্ডে বোমা ফেলে পুরো দেশকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে।
৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ : ব্রিটেন ও ফ্রান্সের যুদ্ধ ঘোষণা১৯১৮ সালের ভার্সাই চুক্তি অনুসারে পোল্যান্ডকে রক্ষার জন্য ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। তবে হিটলারের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তারা কিছুই করতে পারেনি।
১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ : রাশিয়ার হামলাহিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করতে পারে এই আশংকায় ১৭ সেপ্টেম্বর পূর্ব দিক থেকে পোল্যান্ডে হামলা করে রুশ বাহিনী।
৩০ নভেম্বর ১৯৩৯ : সোভিয়েত-ফিনল্যান্ড যুদ্ধসোভিয়েত ইউনিয়ন সৈন্যরা লিথুনিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়ায় প্রবেশ করার পর ফিনল্যান্ড দখলের উদ্যোগ নিলে ফিনল্যান্ড প্রচণ্ডভাবে রুখে দাঁড়ায়। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ৩০ নভেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিনল্যান্ড আক্রমণ করার ভেতর দিয়ে এ বিশ্বযুদ্ধ নতুন মোড় নেয়।
৯ এপ্রিল ১৯৪০ : নরওয়ে ও ডেনমার্ক আক্রমণনরওয়ে ও ডেনমার্কে আগ্রাসন চালিয়ে জার্মান বাহঘিনী নারভিকসহ গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও বিমানবন্দর দখল করে নেয়।
১০ মে ১৯৪০ : জার্মানির ফ্রান্স আক্রমণব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেইনের সংযতকরণ নীতি ব্যর্থ হলে ১৯৪০ সালের ১০ মে পদত্যাগ করেন এবং ক্ষমতায় আসেন উইনস্টন চার্চিল। এদিন জার্মানি ফ্রান্স আক্রমণ করে বসে।
১০ জুলাই ১৯৪০ : ব্রিটেনে যুদ্ধহিটলার এবার ব্রিটেন আক্রমণ করে। স্থল হামলার আগে ব্রিটিশ রয়্যাল বিমান বাহিনীকে বিধ্বস্ত করে ফেলে। নিহত হয় প্রায় ৪৩ হাজার মানুষ। মাত্র ২৪ রাতে ৫৩০০ টন উচ্চ বোমা ফেলা হয় লন্ডনে।
২২ জুন ১৯৪১ : জার্মানির সোভিয়েত আক্রমণ১৯৪১ সালের ২২ জুন সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করেন হিটলার। ইতালি, রোমানিয়া ও ফিনল্যান্ডের সহায়তায় প্রায় ৩০ লাখ জার্মান সেনা রাশিয়ায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। লক্ষাধিক ইহুদিকে হত্যা করে।
৭ ডিসেম্বর ১৯৪১ : পার্ল হারবার আক্রমণজার্মানির মিত্র জাপান হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মার্কিন নৌঘাঁটি পার্ল হারবারে বোমা নিক্ষেপ করে। এর প্রতিশোধে বিশ্বযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র।
২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৩ : স্টালিনগার্ডে জার্মানির আত্মসমর্পণ১৯৪২ সালে রাশিয়ার স্টালিনগার্ডে জার্মানির একটি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে।
৬ জুন ১৯৪৪ : ডি ডেদক্ষিণ ফ্রান্স থেকে ডেনমার্ক এলাকায় জার্মান বাহিনীকে বিস্মিত করে আতর্কিত হামলা চালায় ব্রিটেন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথবাহিনী। এর মাধ্যমে ফ্রান্সকে পুনরায় স্বাধীন করা হয়।
৮ মে ১৯৪৫ : জার্মানি পরাজিতদুনিয়া দখলের হিটলারি স্বপ্ন চুরমার হয়ে ১৯৪৫ সালের ৮ মে জার্মানি চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়।
৬-৯ আগস্ট : পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপপার্ল হারবারে হামলার প্রতিশোধে ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে দুটো পারমাণবিক বোমা ফেলে যুক্তরাষ্ট্র। এতে শহর দুটি ধ্বংস হয়ে যায়।
১৪ আগস্ট ১৯৪৫ : যুদ্ধ শেষঅবশেষে ১৯৪৫ সালের ১৪ আগস্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
☼ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল :
(১) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিশ্বব্যাপী ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞ ঘটনা। এর ফল হয়েছিল মারাত্মক ও সুদূরপ্রসারী। এই যুদ্ধে নব্য আবিষ্কৃত অনেক প্রযুক্তির ধ্বংসাত্মক প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রয়োগ ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের। মহাযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেই এই মারণাস্ত্র উদ্ভাবিত হয় এবং এর ধ্বংসলীলার মধ্য দিয়েই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। যুদ্ধের শেষ দিকে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে ৬ই আগস্ট জাপানের হিরোসিমায় ও ৭ই আগস্ট নাগাসাকিতে আমেরিকা পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করে। আমেরিকার নিক্ষিপ্ত পরমাণু বোমায় জাপানের দুটি শহর হিরোসিমা ও নাগাসাকি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়। মানুষের ইতিহাসে এতবড় ধ্বংসলীলা আর সংঘটিত হয় নি। এই যুদ্ধের ফলে আমেরিকা ও রাশিয়া পৃথিবীর মধ্যে বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের অধিকারী হয়। ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি প্রভৃতি ইউরোপীয় দেশের স্থান হয় দ্বিতীয় সারিতে। ইতালিতে ফ্যাসিবাদী সরকারের জায়গায় প্রজাতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। জার্মানি দ্বিখন্ডিত হয়ে পূর্ব জার্মানি এবং পশ্চিম জার্মানি দুইটি দেশে বিভক্ত হয়।
(২) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্যবাদী আদর্শ দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সর্বপ্রথম রাশিয়ার সাম্যবাদী আদর্শ জয়যুক্ত হয়। পরে চিন, পোল্যান্ড, চেকোশ্লোভাকিয়া, পূর্ব জার্মানি ইত্যাদি দেশ সাম্যবাদী আদর্শ গ্রহণ করে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সমাজতান্ত্রিক প্রবক্তা রূপে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট দল আত্মপ্রকাশ করে। একে কেন্দ্র করে আবার পৃথিবীর রাষ্ট্রসমূহ দুটি শিবিরে ভাগ হয়ে যায়।
একদিকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি এবং তাঁদের মিত্র দেশগুলি, আর অন্যদিকে রাশিয়া, পোল্যান্ড, চেকোশ্লোভাকিয়া, পূর্ব জার্মানি ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশ। এর মধ্যে আবার কয়েকটি দেশ নিরপেক্ষ থেকে যায়। পরবর্তীতে এই রুশ ইউনিয়নই ভেঙে অনেকগুলো ছোট ছোট রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। পশ্চিম ইউরোপের দেশসমূহের সমন্বয়ে গঠিত হয় ন্যাটো আর সমগ্র ইউরোপের দেশসমূহের সীমান্তরেখা নির্ধারিত হতে শুরু করে। ওয়ারস প্যাক্টের মাঝে অন্তর্ভুক্ত দেশসমূহ নিয়ে দানা বেঁধে উঠে স্নায়ুযুদ্ধ। এভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বমঞ্চে অভিনব এক নাটকের অবতারণা করে
আরও পড়ুন-
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস, কারণ এবং ফলাফল
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস
কার্গিল যুদ্ধের ইতিহাস
(৩) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে পরাধীন দেশগুলিতে শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতার লড়াই। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি বুঝতে পরে যে সাম্রাজ্যবাদী শাসনের অবসান ঘটতে আর দেরি নেই। দেশে দেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করে তারা নিজ নিজ উপনিবেশগুলিকে স্বাধীনতা দানে তৎপর হয়। ফলে অনেক দেশ স্বাধীনতা লাভ করে ।
(৪) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের প্রতিষ্ঠা হয়। আজ পর্যন্ত এই বিশ্ব সংস্থা পৃথিবীর শান্তি ও নিরাপত্তা অক্ষুন্ন রাখতে ও মানুষের সার্বিক উন্নয়নে নিরলস প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।







Post A Comment: