কার্গিল যুদ্ধ বা কার্গিল সংঘর্ষ ১৯৯৯ সালের মে-জুলাই মাসে কাশ্মীরের কার্গিল জেলায় ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘটিত একটি সশস্ত্র সংঘর্ষ।
প্রেক্ষাপট
কার্গিল যুদ্ধ হল পারমাণবিক শক্তিধর দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘটিত দ্বিতীয় তথা সাম্প্রতিকতম প্রত্যক্ষ যুদ্ধ। ১৯৯৮ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রই পারমাণবিক অস্ত্রপরীক্ষণ চালায়। যদিও ভারতের প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রপরীক্ষাটি ঘটানো হয় ১৯৭৪ সালে।পাকিস্তান প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রপরীক্ষা কার্যকর্ম চালায় ১৯৮৪ সালে। ভারত বিভাগের পর থেকেই একে অন্যকে শত্রু ভাবে ভারত পাকিস্তান। ১৯৪৭-১৯৪৮, ১৯৬৫, ১৯৭১, ১৯৯৯, ২০১৬ এবং ২০১৯ সালে সর্বশেষ সংঘর্ষ হয় দেশ দুটির মাঝে।তবে ১৯৯৮ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রই পারমাণবিক অস্ত্রপরীক্ষণ চালানোর পর থেকেই শীতল সম্পর্ক পরে রূপ নেয় কার্গিল যুদ্ধে।
পাকিস্তানের অনুপ্রবেশ
পাকিস্তানি ফৌজ ও কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে ডি ফ্যাক্টো সীমান্তরেখা হিসেবে পরিচিত নিয়ন্ত্রণ রেখা বা লাইন অফ কন্ট্রোল পেরিয়ে ভারতে ঢুকে পড়লে এই যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
১৯৯৯ সালের গ্রীষ্মে হঠাত্ করেই খবর পাওয়া গেল, কাশ্মীরের কার্গিল সেক্টরের দখল নিয়েছে পাকিস্তানি সেনা ও কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। প্রথমদিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জড়িত থাকার কথা কোনওভাবেই স্বীকার করেনি পাকিস্তান। বিচ্ছিন্নতাবাদীরাও এই কাণ্ড ঘটিয়েছে বলে উল্টে ভারতের উপরেই বিষোদ্গার করে পাকিস্তান।
তবে যুদ্ধের পর ফেলে যাওয়া তথ্যপ্রমাণ এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের পরবর্তীকালের বিবৃতি থেকে জানা যায় যে পাকিস্তানের আধাসামরিক বাহিনীও এই যুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। ভারত তথ্যপ্রমাণ দিয়ে জানায়, কীভাবে গোপনে ভারতের কার্গিল এলাকা দখলে নিয়েছ পাকিস্তান ও কীভাবে ভারতীয় সেনাদের মেরে ফেলা হয়েছে।
সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মুশারফের সঙ্গে পাক সেনা অফিসারের যুদ্ধ সংক্রান্ত কথোপকথনও প্রকাশ করে একেবারে নির্ভেজাল সত্য তুলে ধরে ভারত।
যুদ্ধক্ষেত্র
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পূর্বে কার্গিল ছিল লাদাখের বালটিস্তান জেলার অংশ। এই অঞ্চলটিতে জনসংখ্যার ঘনত্ব খুব বেশি না হলেও বিভিন্ন ভাষাগত, জাতিগত ও ধর্মীয় সম্প্রদায় বিশ্বের কয়েকটি উচ্চতম পর্বত কর্তৃক বিভাজিত এই অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন উপত্যকাগুলিতে বসবাস করত। প্রথম কাশ্মীর যুদ্ধের (১৯৪৭-৪৮) ফলস্রুতিতে সৃষ্ট নিয়ন্ত্রণ রেখা বা লাইন অফ কন্ট্রোল (এলওসি) বালটিস্তান জেলাটিকে দ্বিধাবিভক্ত করে। কার্গিল জেলা ও কার্গিল শহরটি ভারতীয় রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরের লাদাখ বিভাগের মধ্যে।১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর দুই দেশের মধ্যে সাক্ষরিত শিমলা চুক্তি অনুযায়ী এই সীমান্তকে সম্মান জানিয়ে কোনো রকম সশস্ত্র সংঘাতে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
শ্রীনগর শহর থেকে ২০৫ কিলোমিটার (১২০ মাইল) দূরে নিয়ন্ত্রণ রেখার উত্তরাংশের সম্মুখভাগে কার্গিল শহরটি অবস্থিত। হিমালয়ের অন্যান্য অঞ্চলের মতোই কার্গিলের জলবায়ুও নাতিশীতোষ্ণ ধরনের। এখানে গ্রীষ্মকাল শীতল এবং গ্রীষ্মের রাতগুলি হিমশীতল। শীতকাল দীর্ঘ ও অতিশীতল। শীতের তাপমাত্রা মাঝেমধ্যেই -৪৮° সেন্টিগ্রেট ( -৫৪° ফারেনহাইট)-এ নেমে যায়।
শ্রীনগর থেকে লেহগামী ১ নং জাতীয় সড়ক কার্গিলের উপর দিয়ে গিয়েছে। যে অঞ্চলে এই অনুপ্রবেশ ও সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটে তা ছিল উক্ত জাতীয় সড়কের ঊর্ধ্বে স্থিত একটি ১৬০ কিলোমিটার প্রসারিত শৈলশ্রেণী।জাতীয় সড়কের উপর শৈলশ্রেণীতে অবস্থিত সামরিক আউটপোস্টগুলি প্রায় ৫,০০০ মিটার (১৬,০০০ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত ছিল; কোনো কোনোটি আবার ৫,৪৮৫ মিটার (১৮,০০০ ফুট) উচ্চতাতেও অবস্থান করছিল। জেলা সদর কার্গিল ছাড়া ফ্রন্ট লাইনের নিকটস্থ জনবহুল অঞ্চলগুলি ছিল কার্গিলের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত মুশকো উপত্যকা ও দ্রাস শহর এবং কার্গিলের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বাটালিক সেক্টর ও অন্যান্য অঞ্চল।
ঘটনা প্রবাহ
৩ মে, ১৯৯৯ পাকিস্তানি বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সেনাদের একটি বড় অংশ কার্গিলে ভারতের অংশে ঢুকে এলাকার দখল নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে সেনাবাহিনীর কাছে খবর পৌঁছয়।
৫ মে, ১৯৯৯ ভারতীয় স্থলসেনার একটি দল সেখানে পৌঁছলে পাঁচ সেনা জওয়ানকে আটকে রেখে মেরে ফেলা হয়।
৯ মে, ১৯৯৯ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীর কার্গিলের ঘাঁটি নষ্ট করে দেয়।
১০ মে, ১৯৯৯ পাকিস্তানিদের অনুপ্রবেশ সবচেয়ে প্রথমে লক্ষিত হয় কার্গিলের দ্রাস, কাকসর, মুশকোহ সেক্টরে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি বড় দল কাশ্মীর থেকে কার্গিলে পৌঁছয়।
২৬ মে, ১৯৯৯ অনুপ্রবেশকারী পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বোমারু হামলা চালায় ভারতীয় বায়ুসেনা।
![]() |
| পাকিস্তানি সেনাবাহিনী |
১ জুন, ১৯৯৯ কার্গিল এলাকায় ভারতের ১ নম্বর জাতীয় সড়কে বোমা বিস্ফোরণ করে পাকিস্তান।
৫ জুন, ১৯৯৯ পাকিস্তানি সেনা এতে জড়িত নয় বলে যে দাবি পাকিস্তান করে আসছিল, তা খারিজ করে দিতে যাবতীয় তথ্যপ্রমাণ পেশ করে ভারতীয় সেনা। তিনজন পাকিস্তানি সেনার নাম স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়।
৬ জুন, ১৯৯৯ কার্গিল বিজয়রে উদ্দেশ্যে এবার ঝাঁপিয়ে পড়ে ভারতীয় সেনা।
৯ জুন, ১৯৯৯ বিজয়ের প্রথম সোপান হিসাবে কার্গিলের বালাটিক সেক্টরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গার দখল নেয় ভারতীয় সেনাবাহিনী।
![]() |
| পাকিস্তানের তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মুশাররফ |
জুন ১১, ১৯৯৯ পাকিস্তানি সেনা এই ঘটনায় জড়িত তা ফের তথ্য দিয়ে প্রমাণ করে ভারত। পাকিস্তান সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মুশারফ ও পাক সেনার এক অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজিজ খানের মধ্যে কথোপকথন পেশ করা হয় যাতে স্পষ্ট ছিল, কার্গিলে পাকিস্তানি সেনার জড়িত থাকার কথা।
১৩ জুন, ১৯৯৯ কার্গিলের দ্রাস এলাকার টোলোলিং সেক্টরও কব্জা করে নেয় ভারতীয় সেনা জওয়ানেরা।
১৫ জুন, ১৯৯৯ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে টেলিফোন করে কার্গিল থেকে সরে যাওয়ার কথা বলেন তত্কালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিন্টন।
![]() |
| তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিন্টন। |
২৯ জুন, ১৯৯৯ ফের কার্গিল এলাকার টাইগার হিলের কাছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট 'পয়েন্ট ৫০৬০' ও 'পয়েন্ট ৫১০০' দখল করে ভারতের বীর জওয়ানেরা।
৪ জুলাই, ১৯৯৯ কার্গিল পুনর্দখলে আরও সেনা নিয়ে ঝাঁপায় ভারত।
৪ জুলাই ১৯৯৯, ১১ ঘণ্টার দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ৪ জুলাই ১৯৯৯ তারিখে টাইগার হিল এলাকা পুনর্দখল করে ভারত।
৫ জুলাই, ১৯৯৯ ভারতীয় সেনাবাহিনী কার্গিলের দ্রাস সেক্টরকে পুনরায় দখল করে নেয়। বিল ক্লিন্টনের সঙ্গে কথা বলার পর পাকিস্তানের পিছু হঠার কথা বলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ।
![]() |
| পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। |
১৪ জুলাই ১৪, আন্তর্জাতিক চাপের মূখে ও ভারতের কুটনৈতিক তদ্বিরে তখনকার মার্কি ন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটনের চেষ্টায় তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ যুদ্ধ থেকে পাকিস্তানের সব শেনা প্রত্যাহারের ঘোষনা দেয়। পাকিস্তানের সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষনার পর ভারতের জয়ের কথা ঘোষণা করেন তত্কালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী। এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল, 'অপারেশন বিজয়'।
![]() |
| তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী |
কার্গিলকে টার্গেট করার কারণ
কার্গিলকে টার্গেট করার অন্যতম কারণ এই যে কার্গিল সংলগ্ন অঞ্চলটি মুক্ত সামরিক অবস্থানের জমিদখলমূলক যুদ্ধের জন্য আদর্শ অঞ্চল ছিল।শৃঙ্গগুলির উপর সুপরিকল্পিতভাবে সুরক্ষিত পোস্টগুলির কৌশলগত গুরুত্বের কারণে প্রতিরক্ষাকারীর একটি দূর্গের সুযোগসুবিধা ভোগ করা সম্ভবপর ছিল এখানে। পার্বত্য যুদ্ধে উচ্চভূমি থেকে প্রতিরক্ষাকারীর প্রতি শানিত যে কোনো আক্রমণ চালাতে গেলে আক্রমণকারীর উচ্চতার অনুপাত প্রতিরক্ষাকারীর অনেক বেশি হওয়া প্রয়োজন।তার উপর অতিরিক্ত উচ্চতা ও হিমশীতল তাপমাত্রা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।
পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের স্কারডু শহর থেকে কার্গিলের দূরত্ব মাত্র ১৭৩ কিলোমিটার (১০৮ মাইল)। এইখান থেকে পাকিস্তানি যোদ্ধাদের যুদ্ধের রসদ ও অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করা খুবই সহজ ছিল।
ফলাফল
![]() |
| বিজয় পতাকা কাশ্মীরের মাটিতে |
ভারতীয় বিমান বাহিনীর সহায়তায় কার্গিল পূর্ণ দখল করে ভারতীয় সেনা বাহিনী।বিজয় চুড়ান্ত করে বিজয় পতাকা ওড়ায় কাশ্মীরের মাটিতে, সবই আগের থাকলো বিনিময়ে রক্তের স্রোত বয়ে গেল কার্গিলের বুকে। এই যুদ্ধের ফলে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয় এবং তার ফলস্রুতিতে ভারতে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়বরাদ্দ বাড়ানো হয়। পাকিস্তানে এই যুদ্ধের ফলে সরকার ব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে অস্থিরতার সৃষ্টি হয় এবং ১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সেনাপ্রধান পারভেজ মুশাররফ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন।









Post A Comment: