বিংশ শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হিসেবে ভিয়েতনাম যুদ্ধ ইতিহাসে স্থায়ী আসন গেড়েই থাকবে । ভিয়েতনাম যুদ্ধ ছিল একটি দীর্ঘস্থায়ী বিপ্লব । কোরিয়া যুদ্ধের পর পরই এই যুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৯৭৫ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের আক্ষরিক সমাপ্তি ঘটলেও এর প্রভাব বিদ্যমান ছিল আরো অনেকদিন ।


ভিয়েতনাম যুদ্ধ
ভিয়েতনামের রাজনৈতিক ইতিহাস ও পরিচয়ঃ
ভিয়েতনাম হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র একটি দেশ । প্রায় ১ লক্ষ ২৭ হাজার বর্গ কিলোমিটারের ভূখন্ডে বর্তমানে প্রায় ৯৪ মিলিয়ন মানুষের বাস । দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই দখলদারদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আসছিল । বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জাতি দ্বারা ভিয়েতনাম নিষ্পেষিত হয়ে এসেছে । ভিয়েতনামের সৃষ্টি বহু পূর্ব থেকে । ভিয়েতনামের বীর যোদ্ধা লাই বানের নেতৃত্বে প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র ভান জুয়ান প্রতিষ্ঠিত হয় ৫৪৪ সালে । এরপর ৬০৩ সালে ভান জুয়ান রাষ্ট্রটি চীনের প্রবল চাপে অধিনস্থ হতে বাধ্য হয় । দশম শতকের শুরু থেকেই শুরু হয় ভিয়েতামিজদের গণঅভ্যুত্থান । নো কুয়ান নিজেকে রাজা বলে ঘোষণা করেন । ১২৫৭ সালে ভিয়েতনামে মঙ্গোলীয়রা আক্রমণ করে । 


সর্বশেষে ১২৮৮ সালে কুবলাই খানের আক্রমণে মঙ্গোলীয়রা পরাজিত হয় এবং ভিয়েতনাম দখলের আশা ত্যাগ করেন । প্রায় ৪০০ বছর পর ১৪০৬ সালে পুনরায় ভিয়েতনাম চীন কর্তৃক অধীকৃত হয় । এরপর কৃষক বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে অষ্টাদশ শতাব্দীতে আবার ভিয়েতনাম স্বাধীন হয় । কিন্তু ফরাসী সম্রাট ষোড়শ লুই এর আমলে ভিয়েতনাম আবার বিদেশি শক্তির কাছে ধরাশায়ী হয় । এরপরই ভিয়েতনামের পার্শ্ববর্তী লাওস ও কম্বোডিয়াকেও যুক্ত করে ফরাসীরা সৃষ্টি করে ইন্দোচীন ।

১৮৬০ সাল থেকেই ভিয়েতনামিজরা ফরাসী শাসনের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়তে শুরু করে । এরপর সেই ধারা চালিয়ে নেয় ভিয়েতনামিজ কমিউনিস্ট পার্টি । পরবর্তীতে রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র কায়েম হলে ভিয়েতনামের স্বাধীনতাকামী কমিউনিস্ট বাহিনী আরো শক্তিশালী হয় । আর এই পার্টির গুরুভার পালন করেছিলেন অবিসংবাদিত নেতা হো চি মিন । যিনি বিভিন্ন নামে পরিচিত । তাঁর নেতৃত্বেই গড়ে উঠেছিল “আন্তঃ ঔপনিবেশিক ইউনিয়ন ” এবং তরুণদের নিয়ে ১৯২৪ সালে গঠন করেন “ভিয়েতনাম বিপ্লবী যুব সমিতি”।

বিপ্লবী নেতা হো চি মিন 
হো চি মিন
১৯৩০ সালে হংকং এ গঠিত হয় ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টি । অবশ্য পরে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ইন্দোচীন কমিউনিস্ট পার্টি । হো চি মিন তাঁর জীবনের অনেক বড় অংশ অতিবাহিত করেন প্যারিস, মস্কো ও চীনে । ১৯৪০ সালের দিকে রাশিয়া ও চীনের বৈদেশিক সাহায্য নিয়ে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড শুরু করে দেন প্রচণ্ডভাবে । আর নেতৃত্ব দেবার জন্য দেশে ফিরে আসেন । ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে ইন্দোচীন বলয়ের সব দেশই জাপানের দখলে চলে যায় । 

অবশ্য ভিয়েতনামের গেরিলারা জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে জাপানীদের বিরুদ্ধে চরম গেরিলা আক্রমণ করে । অবশ্য প্রচণ্ড বাধা অতিক্রম করে জাপান সমগ্র ভিয়েতনামে ১৯৪৫ সাল নাগাদ ক্ষমতা কায়েম করতে সমর্থ হয় । ওদিকে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক হামলা জাপানকে যুদ্ধ সমাপ্তির দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায় । ভিয়েতনাম এর পূর্ণ সুযোগ কাজে লাগিয়ে হ্যানয় অবরোধ করে শত্রুমুক্ত করতে সক্ষম হয় । এরপর হো চি মিন অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন । 

উত্তর ভিয়েতনামে হো চি মিন সরকার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলেও দক্ষিণ ভিয়েতনামে গঠিত হয় পাল্টাপাল্টি আরেকটি সরকার । ফরাসী বাহিনী ব্রিটিশদের সহায়তায় এই বৈরি সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণপন্থী সরকারের উপর পূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয় ।

ভিয়েতনাম বিভক্তকরণ ও যুদ্ধের সূচনাঃ




১৯৫৪ সালের বিভক্ত ভিয়েতনাম 
১৯৫৪ সালে ভিয়েতকংদের আক্রমণে ফরাসী ঘাঁটি “দিয়েন বিয়েন ফু”র পতন ঘটে । এর ফলেই ১৯৫৪ সালের আগস্টে জেনেভা সম্মেলন ডাকা হয় । সেখানে একটি চুক্তির মাধ্যমে বলা হয় যে, ১৭’ রেখা বরাবর ভিয়েতনামকে দুভাগে ভাগ করা হবে । 
উত্তর ভিয়েতনামে রুশ ও চীনাপন্থী সমাজতান্ত্রিক হো চি মিন সরকার ও দক্ষিণ ভিয়েতনামে বাও দাই সরকার যারা কিনা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করত । লওস ও বর্তমান কম্বোডিয়ার স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হয় এবং গণভোট আয়োজনের কথাও বলা হয় । অবশ্য গণভোট আয়োজন করা সম্ভব হয়নি । এর আগেই দক্ষিণে বাও দাইকে পদচ্যুত করে নাগো দিয়েন দিয়েম নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন । 

তখন ছিল স্নায়ু যুদ্ধের একটি উত্তেজনাপূর্ণ সময় । সোভিয়েত রাশিয়া বনাম যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত তুঙ্গে । দক্ষিণের দিয়েম সরকারকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দেয় । অন্যদিকে উত্তরের হো চি মিন সরকারকে সমর্থন দেয় রাশিয়া । হঠাৎই ১৯৬৩ সালে এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দিয়েম সরকারের পতন ঘটে । এরপর দক্ষিণ ভিয়েতনামে একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটতে থাকে । ১৯৬৪ সালে টংকিং উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর উপর উত্তর ভিয়েতনাম বোমাবর্ষণ করে । সাথে সাথে ওয়াশিংটনও উত্তর ভিয়েতনামের উপর বোমাবর্ষণের নির্দেশ দেয় । অবশ্য ১৯৬১ সালেই যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামে সৈন্য পাঠিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে । 

যাহোক ১৯৬৪ এর পর যুদ্ধ আস্তে আস্তে ভয়াবহতার দিকে ধাবিত হতে থাকে । যুক্তরাষ্ট্র ১৯৬৫ সাল নাগাদ প্রায় দেড় লক্ষ সৈন্য ভিয়েতনামে প্রেরণ করে । এর আগেই উত্তর ভিয়েতনামের উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট । অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন তদ্রূপ এদের সহায়তায় এগিয়ে আসে । যুদ্ধ প্রচণ্ড গতিতে এগিয়ে চলে । এদিকে দক্ষিণ ভিয়েতনামে মার্কিন প্রভাবাধীন একটি অন্তর্বর্তী নির্বাচনে নগুয়েন ভন থিও প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত হন । থিও সরকার জনগণের মধ্যে অতটা প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়নি । যুদ্ধ তখন তুঙ্গে । 

আমেরিকা প্রায় পাঁচ লক্ষ সৈন্য ততোদিনে ভিয়েতনামে মোতায়েন করে ফেলে । মার্কিনরা যুদ্ধটা যত সহজ ভেবেছিল বাস্তবে তা ঘটেনি । পাহাড় অরণ্যে ভরা ভিয়েতনামের গ্রামীণ অঞ্চলে মার্কিন বাহিনী ততটা সুবিধা করতে পারছিল না । জাতীয় মুক্তিফ্রন্টের সৈন্যরা মার্কিন সংরক্ষিত দক্ষিণ ভিয়েতনামে দিনে-দুপুরে হামলা চালাত ।
খোদ যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধ বিরোধী বিক্ষোভ

চুক্তির জন্য ব্যাকুল যুক্তরাষ্ট্র:
১৯৬৮ সালে নিক্সন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ভিয়েতনামে মার্কিন সেনারা নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে।এত অত্যাচার ও নৃশংসতার পরেও যুদ্ধ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয় যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে গেরিলা আক্রমণে তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও তাদের ধারণার সীমানা পার করে গেছে। নিরুপায় হয়ে তাই যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসার জন্য একটি সম্মানজনক উপায় খুঁজতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। এই উদ্দেশ্যে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক যোদ্ধাদের সঙ্গে প্রকাশ্যে ও গোপনে বেশ কিছু বৈঠকের আয়োজন করে তারা। ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আলোচনার মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়। এ সময় ভিয়েতনামের প্রতিনিধিত্ব করেন জুয়ান থুই ও লি ডাক থো, আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার।

এতগুলো বৈঠকের ফল হিসেবে ১৯৭৩ সালের ২৩ জানুয়ারি প্যারিসে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই শান্তিচুক্তিতে ৮০ দিনের মধ্যে মার্কিন যুদ্ধ বন্দীদের মুক্তি দেয়া, যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা ও দক্ষিণ ভিয়েতনামে সাধারণ নির্বাচন দেয়ার বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়। ২৯ মার্চের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নিলেও কিছু কিছু অঞ্চলে তখনো বোমা বর্ষণ অব্যাহত ছিল। এই সূত্র ধরে উভয় পক্ষই যুদ্ধ বিরতি ভেঙে আবারো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৩ সালের ১৩ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর ভিয়েতনাম যৌথভাবে প্যারিস চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্বাক্ষর করে।
ভিয়েতনামে বিপন্ন আমেরিকান সৈন্যরা 
ভিয়েতনাম যুদ্ধের কারণ

উত্তর ভিয়েতনাম – দক্ষিণ ভিয়েতনাম দ্বন্দ্ব: প্রাথমিক ভাবে আভ্যন্তরীণ ব্যাপার হলেও তা দুই ব্লকে ছড়িয়ে পরে।
মার্কিনিদের সমাজতাত্ত্বিক ভয়: যেখানেই যখন সমাজতত্ত্ব মাথা চাড়া দিয়েছে, সেখানেই মার্কিন নাশকতা পরিলক্ষিত হয়।
চীন – রাশিয়ার মদদ: এই যুদ্ধে এই দুই পরাশক্তির প্রত্যক্ষ সাহায্য করেছিলো। যা যুদ্ধকে আরো গতিশীল করে ছিলো।

মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের মানুষিকতা: মার্কিনীদের একটি মানুষিকতা হলো অন্যের বিষয়ে নাক গলানো।
শো অফ: মার্কিনিরা দেখাতে চেয়েছিলো তাদের শক্তি। এবং তাদের যা অপছন্দ তা তারা করতে দিবে না যদিও তা অন্যায়।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের ফলাফল
মানবতার কান্না:
 দুই দশক ধরে চলা ভয়াবহ এই যুদ্ধে প্রায় ৩২ লাখ ভিয়েতনামিজ মারা যায়। শুধু ভিয়েতনামের জনগণই নয়, প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্র লাওস ও কম্বোডিয়ার প্রায় ১৫ লাখ নিরীহ মানুষও এই যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করে।
ছবিটিই বলে দিচ্ছে যুদ্ধের তীব্রতা
যুক্তরাষ্ট্র এবং এর মিত্রের পরাজয়: এই যুদ্ধে মার্কিন সেনা মারা যায় প্রায় ৬০ হাজার। পরে মার্কিন জনগণ আন্দোলন করে যে তাদের ছেলেদের ঘরে ফিরিয়ে আনতে হবে।


এই অঞ্চলে চীন-রাশিয়ার আধিপত্য বিস্তার: স্পষ্টত এই ভিয়েতনাম যুদ্ধ চীন এবং রাশিয়ার জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনে। এই দুই পরাশক্তি নিজ মহিমাময় আসার সুযোগ পেয়ে যায়।
বিশ্ব দরবারে মার্কিন বিরোধী জনমত: এই ভিয়েতনাম যুদ্ধ মার্কিনী বিরোধী মনোভব জাগিয়ে তুলে।
নাপাম বোমার ব্যবহার: ১৯৬৮ সালে নিক্সন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভয়াবহতা ও নৃশংসতা আরো বেড়ে যায়। ভিয়েতনামে মার্কিন সেনারা নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে। নৃশংসতার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ভিয়েতনামের নিরীহ মানুষদের উপর নাপাম বোমা নিক্ষেপ করা শুরু করে। পৃথিবী অবলোকন করে এক মারণাস্ত্র। আর এই সব রাসায়নিক অস্ত্র মানবতার জন্য সরাসরি হুমকি।
স্নায়ু যুদ্ধ নতুন রূপে: কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস, বার্লিন প্রাচীর সমস্যা বা অন্যান্য ঠাণ্ডা যুদ্ধের মত এই ভিয়েতনাম যুদ্ধ ছিলো না। এটা ছিলো সরাসরি যুদ্ধ। যা কোল্ড ওয়ারের সব থেকে রক্তাক্ত উদাহরণ।
ভিয়েতনামের স্বাধীনতা: দুই ভিয়েতনাম একত্রিত হবার পথে যাত্রা শুরু করে। আজ যে স্বাধীন এবং একক ভিয়েতনাম দেখতে পাচ্ছি তা এই ভিয়েতনাম যুদ্ধ ফল।

তথ্যসূত্রঃ
১.বিবিসি
২.উইকিপিডিয়া
Share To:

K. Nayeem

Post A Comment: