যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান রাষ্ট্র। এটি কথার কথা না। যে দেশের ৮০০ মিলিটারি বেস আছে এবং পুরো বিশ্বে সামরিক বাহিনীর পেছনে মোট যত খরচ হয় তার ৩৭ শতাংশই যে দেশের সামরিক বাহিনীর পেছনে খরচ করা হয় তাকে তো সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র না বলে উপায় নেই।
আমেরিকার বর্তমান অবস্থান এবং কেন এটি বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রস্বরূপ তা অনুধাবন করতে হলে আমাদেরকে তার পূর্ব ইতিহাসের প্রতি নজর দিতে হবে। আমাদেরকে ফিরে তাকাতে হবে সেই সময়টায় যখন আমেরিকাকে গুটি কয়েক দেশ ছাড়া অন্য কেউ চিনত না।




১৭৭৬ সালে আমেরিকা প্রতিষ্ঠার পর প্রথম ৭০ বছর পর্যন্ত তাদের একমাত্র নেশা ছিল সাম্রাজ্য বাড়ানো। প্রমাণস্বরূপ বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র তার আওতায় ১৮০৩ সালে লুইজিয়ানা, ১৮১০-১৮১৯ সালের মধ্যে ফ্লোরিডা, ১৮৪৫ সালে টেক্সাস, ১৮৪৬ সালে ওরেগন, ১৮৪৮ সালে মেক্সিকান সাম্রাজ্য নিয়ে আসে। তখন যুক্তরাষ্ট্র উত্তর আমেরিকাকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বর্ধিত করার তাড়নায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

এদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীও দখলের কাজে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে। কেউ বাঁধা দিতে এলে সঙ্গে সঙ্গে গুলি। প্রারম্ভিককালে স্থানীয় বাসিন্দারা বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। তারা কি আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে নিজেদের পরিসীমা বর্ধিত করবে নাকি প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যায়। ১৮৬৫ সালে সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে গৃহযুদ্ধ শেষ হয়। কিন্তু এরপর নেতাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়। তাদের মধ্যে উইলিয়াম এইচ সেওয়ার্ড এর মতে, আমেরিকাকে বিশ্বের সকল ক্ষমতার নিয়ন্ত্রনকারী হতে হবে। তিনি মনে করেন সব উন্নত দেশকেই উন্নত হবার জন্য আগে নিজের পরিসীমা বাড়াতে হয়।

তারই ধারাবাহিকতায় সেক্রেটারি সেওয়ার্ড রাশিয়ার কাছ থেকে আলাস্কা কিনে নেওয়ার সফলতা অর্জন করেন। কিন্তু বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় কংগ্রেস। এর জন্য মি. সেওয়ার্ড গ্রীনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও ক্যারিবিয়ান ভূ-খন্ড কিনতে ব্যর্থ হন। এর প্রধান কারণ হলো অনেক মার্কিন নাগরিকই সাম্রাজ্যবাদের বিরোধী ছিল। তারা নিজের দেশকে নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন ছিল। যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে বিশ্ব রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছিল এবং অপ্রধান জনগোষ্ঠী থেকে জনসংখ্যাকে প্রায় টেনে-হিঁচরে নিয়ে আসছিল তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিল।

১৮০০ শতকের শেষের আমেরিকা প্রসারণের যে প্রবণতা ছিল তাতে কিছুটা ছেদ পড়ে। সে সময় আমেরিকায় বাণিজ্যিক বিপ্লব ঘটে এবং তাদের অর্থনীতিতে যেন এক বিরাট বিস্ফোরণ ঘটে যায়। তখন তারা বুঝতে পারে এই বর্ধিষ্ণু অর্থনীতি ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন সঠিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও একত্রিত জনগোষ্ঠী। তখন সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয় একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করার। এরই ফলশ্রুতিতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন উইলিয়াম মিখেনলি। তিনি ছিলেন আমেরিকা প্রসারণের পক্ষে একজন কট্টর নেতা। ১৮৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস নতুন মোড় নেয়। আমেরিকা স্পেনের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং খুব সহজেই স্পেনকে পরাজিত করে। ফলে কিউবা, পুয়ের্তো রিকো, গুয়াম, ফিলিপাইন প্রভৃতি রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে চলে আসে। পরবর্তী দুই বছরে আমেরিকা হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ (১৮৯৮), ওয়েক আইল্যান্ড (১৮৯৯), সামোয়া দ্বীপ (১৯০০) দখল করে। ১৯০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র পানামা খাল ও আশপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং ১৯১৬ সালে ডমিনিকান রিপাবলিক ও ১৯১৭ সালে আমেরিকান ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ দখল করে। এভাবে দখলের পর দখল করে আমেরিকা একসময় বিশ্বমানচিত্রে পরাশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।

আমেরিকা এরপর থেকেই পৃথিবীর অন্য অনেক দেশেই বাণিজ্যিক ও সামরিক ক্ষমতা প্রদর্শন করতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কতটা প্রভাব তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধেই পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ততকালীন প্রেসিডেন্ট উইলসন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বন্ধের দাবিতে প্যারিসে সম্মেলন করেন এবং এ সম্মেলনের পর প্রকৃত অর্থেই শান্তি ফিরে আসে। বন্ধ হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। তিনি বিশ্বে সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য জাতিপুঞ্জ গঠন করেন। তাঁর এই পদক্ষেপে বিশ্বের বেশকিছু দেশ সাড়া দেয়। তারা সবাই মিলে সেখান থেকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক অর্গানাইজেশন (আইএলও) গঠন করে। এর ফলে শ্রমিকেরা তাদের অধিকার ফিরে পায়।

অন্যদিকে সবার অলক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বরাজনীতিতে তার প্রভাব বাড়াতে থাকে। কিন্তু কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট উইলসনের পদক্ষেপকে অগ্রাহ্য করে যুক্তরাষ্ট্রকে জাতিপুঞ্জ থেকে সরিয়ে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বরাজনীতি থেকে সরে আসার চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু যেভাবে আমেরিকা বহির্বিশ্বের সাথে জড়িয়ে গিয়েছিল, তার পক্ষে ফেরত আসা অতটা সহজ ছিল না। হয়ত এটা অসম্ভবই ছিল। এদিকে এশিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ জাপান ভালোভাবে নেয় নি। জাপান এর বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ জানায়। ১৯৪১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল হারবারে হামলার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের সামনে অন্যরকমভাবে উপস্থাপন করে। যুক্তরাষ্ট্রের এত হিংস্রতা বিশ্ববাসী তার আগে কখনো দেখেনি। সেসময় পারমাণবিক অস্ত্রের একমাত্র মালিক ছিল তারা। যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানে যে ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল তা দেখে বিশ্ববাসী আতংকিত হয়ে গিয়েছিল।

তাই পৃথিবীর বুকে যেন আর এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে তার জন্য সৃষ্টি হয় জাতিসংঘ। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর সৃষ্টি হওয়া জাতিসংঘের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। আর সে লক্ষ্যেই পৃথিবীর ৪৪টি দেশ মিলে গঠন করে জাতিসংঘ। এর ফলে তাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরণের সুযোগ সুবিধার সৃষ্টি হয়। যেমন— কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন, আন্তর্জাতিক বাজার বিনিময় প্রথা চালু হয়।

সৃষ্টি হয় বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মূদ্রা তহবিল। এই সংগঠনগুলো তৈরি করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এটা প্রমাণ করতে চায় যে তারা আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধানে খুবই সতর্ক। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন এশিয়া ও পশ্চিম ইউরোপে প্রভাব বিস্তার শুরু করে এক সময়। কিন্তু এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব বাণিজ্যের প্রভাবের জন্য হুমকিস্বরূপ। রাশিয়ার এভাবে অগ্রসর হওয়াকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ শংকিত হয়ে পড়ে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিল যে করেই হোক রাশিয়াকে কোনভাবে ইউরোপে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না। এ লক্ষ্যে তারা নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (ন্যাটো) গঠন করে। এটি একটি সামরিক সংগঠন।

ন্যাটো একাই সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বিস্তার রোধ করে এবং ইউরোপকেও সংঘবদ্ধ রাখতে সক্ষম হয়। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে কমিউনিজম বন্ধ করতে বদ্ধ পরিকর। শুধু তাই নয়, গোটা বিশ্বে যেন সমাজতন্ত্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যায়। কারণ আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র। রাশিয়াকে চাপে রাখার জন্য আমেরিকা সৌদি আরব, ইসরায়েল ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপন করে। আমেরিকা গোপনে আরও অনেক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হহস্তক্ষেপ করতে থাকে আর রাশিয়ার সাথে কোন ধরণের সম্পর্ক না রাখার জন্য সেসব দেশকে প্রভাবিত করতে থাকে।

সেজন্য প্রয়োজনবোধে আমেরিকা অর্থ ও সশস্ত্র বাহিনী দুটো দিয়েই সাহায্য করেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে ইরানকে সাহায্য করা, ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানকে এবং ১৯৮৫ সালে নিকারাগুয়াকে সহায়তা প্রদান করা। এমনকি ওয়াশিংটনের সহায়তায় ইসরায়েল ও জাপানের মতো দেশ তাদের অঞ্চলে সম্পূর্ণরূপে যুদ্ধ প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভার যার কাঁধেই পড়ুক না কেন, সবার লক্ষ্য ছিল একটাই যুক্তরাষ্ট্রকে শীর্ষে রাখা ক্ষমতায়, শক্তিতে, অর্থে।


জেনে নিন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রটির সামরিক ক্ষমতা

ধরণ যুক্তরাষ্ট্র
সক্রিয় সেনা ১২ লাখ ৮১ হাজার ৯০০জন
রিজার্ভ সেনা ৮ লাখ ৬০ হাজার
ট্যাংক ৬ হাজার ২৮৭টি
সাঁজোয়া যান ৩৯ হাজার ২২৩টি
স্বয়ংক্রিয় আর্টিলারি ৯৯২টি
তোয়ানো আর্টিলারি ৮৬৪টি
রকেট প্রজেক্টর ১ হাজার ৫৬টি
সামরিক বিমান ১৩ হাজার ৩৯৮টি
যুদ্ধবিমান ২ হাজার ৩৬২টি
অ্যাটাক বিমান ২ হাজার ৮৩১টি
পরিবহন কাজে ব্যবহৃত বিমান১ হাজার ১৮৩টি
প্রশিক্ষণ বিমান ২ হাজার ৮৫৩টি
হেলিকপ্টার ৫ হাজার ৭৬০টি
অ্যাটাক হেলিকপ্টার ৯৭১টি 
বিমান বন্দর ১৩ হাজার ৫১৩টি 
প্রধান বন্দর ৩৩ টি 
মোট সাবমেরিন  ৬৮ টি  
নৌবাহিনীর মোট জাহাজ  ৪১৫টি
বিমানবাহী রণতরী ২৪টি
দ্রুতগামী যুদ্ধজাহাজ (ফ্রিগেট)  ২২টি
ডেস্ট্রয়ার ৬৮টি
করভেটস্ (রণতরী) ৮২টি
পেট্রোল ভ্যাসেলস (টহল জাহাজ) ১৩টি
মা্ইন ওয়ারফেয়ার ১১ টি
Share To:

K. Nayeem

Post A Comment: