বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেনা নিয়োগের ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। এতে বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন সামরিক লক্ষ্য প্রতিফলিত হয়। সেনা নিয়োগ সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি জোরদারের গুরুত্বপূর্ণ উপায় এবং কোনও একটি দেশের সেনা নিয়োগ সংক্রান্ত আইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেনা নিয়োগের ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। সে পদ্ধতিগুলোর তিনটি ধারা আছে। 
এক, বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ ব্যবস্থা। 
দুই, সেচ্ছাসেবক সেনা নিয়োগ ব্যবস্থা এবং 
তিন, এই দু পদ্ধতিতে সেনা নিয়োগ করা।

সতের শ' উননব্বই থেকে ১৭৯৪ সাল পর্যন্ত ফ্রান্স আন্দোলনের সময় বিরোধী শক্তিকে প্রতিরোধের জন্য ফ্রান্স সরকার বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ সংক্রান্ত ব্যবস্থা চালু করে। যার ফলে সেনা সংকটের সমাধানের পাশাপাশি যুদ্ধের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। এরপর নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সময় এ সেনাবাহিনী সারা ইউরোপে যুদ্ধ জয় করে।

বর্তমানে এমন বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ ব্যবস্থা গ্রহণের অন্যতম ও প্রতিনিধিত্বশীল দেশ হলো ইসরায়েল। বিশেষ ভৌগলিক পরিবেশ এবং জটিল ঐতিহাসিক কারণে ইসরায়েল বহু বছর ধরে শক্তির মাধ্যমে অস্তিত্ব বজায় রাখার নীতি মেনে চলছে। সেজন্য এ দেশে একটি যুদ্ধদক্ষ সেনাবাহিনী দরকার হয়। কিন্তু ইসরায়েলের জনসংখ্যা মাত্র ৭৫ লাখ। একটি বড় সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে অনেক জনশক্তি প্রয়োজন। সেজন্য এ দেশে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ ব্যবস্থা চালু করা হয়।

স্বেচ্ছাসেবক সেনা নিয়োগ ব্যবস্থা হলো সেনাবাহিনীর সঙ্গে ব্যক্তির আইনগত চুক্তির মাধ্যমে সেনা নিয়োগ করা। সেনা কর্তৃপক্ষ সে ব্যক্তিকে বেতন, অন্যান্য সুবিধা ও প্রশিক্ষণ দেয়। সেনারা চুক্তি অনুযায়ী বাহিনীতে সেবা দেয়। এ চুক্তিতে আবদ্ধ হলে সেনারা কোনও বিশেষ কারণ ছাড়া ইচ্ছেমতো চুক্তি থেকে সরে আসতে পারে না, যেটা সম্ভব হয় সাধারণ কর্মচুক্তির ক্ষেত্রে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনসহ অধিকাংশ ন্যাটো সদস্য দেশ এবং ইউরোপীয় দেশগুলোতে এ ধরনের সেনা নিয়োগের ব্যবস্থা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৩ সাল থেকে স্বেচ্ছাসেবক সেনা নিয়োগ সংক্রান্ত ব্যবস্থা চালু করে। এতে দেশপ্রেমবোধ ও দেশের দৃষ্টিভঙ্গির কথা জোরদার করার পাশাপাশি উচ্চ বেতন ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ জনশক্তিকে সেনাবাহিনীতে আকর্ষণ করা হয়। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও স্পেনসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশ পর্যাক্রমে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগের ব্যবস্থা বাতিল করে এবং পেশাগত সেনা নিয়োগ ব্যবস্থা চালু করে। তারও ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। 


প্রথমত, স্নায়ুযুদ্ধ শেষে ইউরোপে নিরাপত্তা পরিবেশ ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পর ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর হুমকি অনেক কমেছে। সেজন্য বড় সেনাবাহিনী বজায় রাখার দরকার নেই তাদের। 

দ্বিতীয়ত, স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়া সত্ত্বেও সামরিক সংঘাত ও আঞ্চলিক যুদ্ধ হতে পারে। সেজন্য বিশেষ সেনাবাহিনী ও দ্রুত সাড়া দেওয়া বাহিনী গড়ে তোলা এবং সেনাবাহিনীকে পেশাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশে প্রাধান্য পায়। 

তৃতীয়ত, সামরিক প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সেনার সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে উচ্চ দক্ষতার সেনাদল গড়ে তোলার প্রয়োজন দেখা দেয়।

স্বেচ্ছাসেবক সেনা নিয়োগ ব্যবস্থা রাখা দেশগুলোর মধ্যে একটি হলো জাপান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর জাপানকে নিরস্ত্রীকরণ করা হয়। তারপর জাপানে স্বেচ্ছাসেবক সেনা নিয়োগ ব্যবস্থা চালু হয়। সকল সেনা নিজেকে আত্মরক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে আখ্যায়িত করে। তারা আসলে জাতীয় ক্যান্ডি। যেখানে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে, সেটা হলো জাপান সরকার বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ ব্যবস্থাকে সংবিধান-পরিপন্থী ব্যবস্থা হিসেবে দেখে।

চীনে বাধ্যতামূলক ও স্বেচ্ছাসেবক সেনা নিয়োগ সংক্রান্ত ব্যবস্থার সহাবস্থান রয়েছে। এ ব্যবস্থা গ্রহণের কারণ হলো প্রথমত, বড় আকারের আক্রমণ প্রতিরোধ করা; দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন বিভিন্ন জাতি ও মহলের যুবকদের মধ্যকার ঐক্য দৃঢ় করা; এবং তৃতীয়ত, সশস্ত্র বাহিনীর জনশক্তি নির্দিষ্ট সময় অন্তর নবায়ন করা। যদি বড় আকারের আক্রমণের হুমকি না থাকে, তাহলে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ ব্যবস্থা বাতিল করা যায়। কিন্তু স্বেচ্ছাসেবক সেনা নিয়োগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। আর্থিক দিক থেকে বললে, চীন বর্তমানে উচ্চ বেতন বহন করতে পারে না। সেজন্য যে সেনা নিয়োগ ব্যবস্থা বহাল রয়েছে, তা চীনের জাতীয় পারিবেশিক, রাজনৈতিক ও সামরিক চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুগে বিভিন্ন দেশ ভিন্ন ভিন্ন সেনা নিয়োগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কিন্তু সে সব ব্যবস্থার লক্ষ্য অভিন্ন। সে লক্ষ্য হলো সেনা নিয়োগ করে সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করা এবং দেশের সামরিক কৌশলের চাহিদা মেটানো।
Share To:

K. Nayeem

Post A Comment: